ক্রিকেট একটি অনিশ্চয়তার খেলা। মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে বল ব্যাটে লাগে, প্যাডে লাগে কিংবা সামান্য লাইনের বাইরে চলে যায়, যা অনেক সময় আম্পায়ারের চোখে ধরা পড়ে না। একসময় একটি ভুল সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফল পাল্টে দিত। এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই এসেছে ক্রিকেটে DRS- Decision Review System।
ক্রিকেটে DRS ব্যবহারের ফলে খেলার ন্যায্যতা বেড়েছে, মানবিক ভুল কমেছে এবং দলগুলো নিজেদের সুযোগ আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারছে। এখন প্রায় সব আন্তর্জাতিক ম্যাচেই ডিআরএস ব্যবহার করা হয়।

DRS কী? (What is DRS in Cricket?)
DRS-এর পূর্ণরূপ Decision Review System, যা খেলোয়াড়দের সুযোগ দেয় মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার। মাঠের আম্পায়ার যখন কোনো আউট বা নট আউট সিদ্ধান্ত দেন, তখন খেলোয়াড় বা দল মনে করলে যে সিদ্ধান্তটি ভুল হয়েছে, তারা ক্রিকেটে DRS ব্যবহার করে থার্ড আম্পায়ারের কাছে সেই সিদ্ধান্ত পুনরায় চ্যালেঞ্জ করতে পারে। খেলার ন্যায্যতা বজায় রাখা, ভুল সিদ্ধান্ত কমানো এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে অধিক নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করাই এই সিস্টেমের মূল উদ্দেশ্য।
ক্রিকেটে DRS এর ইতিহাস
ক্রিকেটে DRS প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় ২০০৮ সালে ভারত–শ্রীলঙ্কা সিরিজে। যদিও এটি শুরুতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, কিন্তু তখন এটি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়নি। পরবর্তীতে প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে ২০১১ সালের বিশ্বকাপে আংশিকভাবে এবং ২০১৭ সাল থেকে ICC সকল আন্তর্জাতিক ম্যাচে পূর্ণাঙ্গভাবে ক্রিকেটে DRS বাধ্যতামূলক করে। বল-ট্র্যাকিং, স্নিকো, আল্ট্রা-এজ এবং হটস্পটের মতো উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় DRS আজকের দিনে ক্রিকেটের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সিস্টেম।
ক্রিকেটে DRS কীভাবে কাজ করে? ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা
DRS পুরোপুরি একটি ধাপে ধাপে চলা প্রক্রিয়া। প্রথমে মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট দল সন্তুষ্ট না হলে ক্যাপ্টেন বা ব্যাটার ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে রিভিউ নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। রিভিউ নেওয়ার পর সিদ্ধান্তটি থার্ড আম্পায়ারের কাছে পাঠানো হয়, যেখানে বিভিন্ন প্রযুক্তির সহায়তায় পুনর্বিবেচনা করা হয়। থার্ড আম্পায়ার রিপ্লে, স্লো মোশন, বল-ট্র্যাকিং, আল্ট্রা-এজ, হটস্পট—সব মিলিয়ে সবচেয়ে নির্ভুল ফল নির্ধারণ করেন। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মাঠের আম্পায়ারকে জানানো হয় এবং তিনি সেই অনুযায়ী সিগনাল দেন।
A. বল-ট্র্যাকিং প্রযুক্তি (Ball Tracking / Hawk-Eye)
ক্রিকেটে DRS এর মূল অংশ হলো বল-ট্র্যাকিং বা Hawk-Eye প্রযুক্তি। এটি বল কোথায় পিচ করেছে, কোথায় ইমপ্যাক্ট হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত বলটি স্টাম্পে লাগতো কি না—এসব তথ্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখায়। LBW সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি LBW সিদ্ধান্ত নির্ভর করে বল স্টাম্প লাইনে পিচ করেছে কি না, ব্যাটার কোথায় ছিল এবং বল স্টাম্পে লাগার সম্ভাবনা কতটুকু তার ওপর। Hawk-Eye এর প্রযুক্তি ছয় বা সাতটি ক্যামেরার মাধ্যমে বলের গতিপথ তিন–মাত্রিকভাবে বিশ্লেষণ করে। ক্রিকেটে DRS ব্যবহারে এই প্রযুক্তি সিদ্ধান্তকে প্রায় ভুলহীন করে তুলেছে।
B. Ultra-Edge বা Snickometer
Ultra-Edge হলো এমন একটি প্রযুক্তি যা বল ব্যাট, গ্লাভস বা অন্য কোনো অংশ স্পর্শ করেছে কি না তা সনাক্ত করে। অত্যন্ত ক্ষুদ্র শব্দও Ultra-Edge শনাক্ত করতে পারে। রিপ্লে–র সাথে অডিও ওয়েভ মিলিয়ে ব্যাটে বল লেগেছে কি না, সেটি বোঝা যায়। ক্যাচ, ব্যাট–প্যাড বা সামান্য এজের সিদ্ধান্তে এটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি। ক্রিকেটে DRS ব্যবহারে Ultra-Edge অসংখ্য বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সঠিক করেছে।
C. Hotspot
হটস্পট হলো তাপঘর্ষণ নির্ভর প্রযুক্তি যা বল ব্যাট, গ্লাভস বা প্যাডে লাগলে ছোট্ট সাদা দাগ হিসেবে দেখায়। ক্যামেরায় ইনফ্রারেড প্রযুক্তির মাধ্যমে এই দাগগুলো ধরা পড়ে। যদিও অনেক সময় খুব হালকা এজ ধরা পড়ে না, তাই Ultra-Edge অধিক নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তবু ব্যাট–প্যাড ক্যাচ বা গ্লাভসে বল লাগা শনাক্তে হটস্পট এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আম্পায়ার্স কল (Umpire’s Call)
DRS-এর সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো আম্পায়ার্স কল। যখন বল-ট্র্যাকিং দেখায় যে সিদ্ধান্তটি খুবই কাছাকাছি ছিল এবং তা স্পষ্টভাবে আউট বা নট আউট হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না, তখন থার্ড আম্পায়ার আগের অন-ফিল্ড আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বজায় রাখেন। এই অবস্থায় রিভিউ নষ্ট না হলেও দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয় না। ক্রিকেটে DRS ব্যবহারে আম্পায়ার্স কল নিয়মটি ন্যায্যতার জন্য তৈরি হলেও মাঝে মাঝে এটি বিতর্ক সৃষ্টি করে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সমস্ত রিপ্লে, অডিও, ভিজ্যুয়াল এবং বল-ট্র্যাকিং রিপোর্ট বিশ্লেষণ করার পর থার্ড আম্পায়ার তার সিদ্ধান্ত মাঠের আম্পায়ারকে জানান। মাঠের আম্পায়ারও সেই নির্দেশ অনুযায়ী আউট বা নট আউটের সিগনাল দেন। এভাবেই ক্রিকেটে DRS প্রযুক্তি প্রতিটি সিদ্ধান্তকে নিখুঁতভাবে যাচাই করে।
ক্রিকেটে DRS-এ কয়টি রিভিউ পাওয়া যায়?
টেস্ট ম্যাচে প্রতি ইনিংসে দুইটি করে রিভিউ পাওয়া যায় এবং ৮০ ওভার পর তা আবার রিফ্রেশ হয়। ওয়ানডে ম্যাচে প্রতিটি দল এক ইনিংসে একটি রিভিউ এবং টি–টোয়েন্টি ম্যাচেও একটি রিভিউ ব্যবহার করতে পারে। আম্পায়ার্স কলের সিদ্ধান্ত হলে রিভিউ নষ্ট হয় না, যা দলগুলোর জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করে।
ক্রিকেটে DRS কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ক্রিকেটে DRS খেলাকে আরও ন্যায্য ও সঠিক করেছে। আজ আর একটি ভুল সিদ্ধান্তে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয় না। ব্যাটার ভুল আউট হলে বেঁচে যাওয়ার সুযোগ পায়, বোলিং দল নিশ্চিত হতে পারে যে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য তাদের অধিকার রয়েছে। মানবিক ভুল কমানোর দিক থেকেও ক্রিকেটে DRS একটি বিপ্লবী সংযোজন। দর্শকরাও রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে বলে খেলা আরও উপভোগ্য হয়। সব মিলিয়ে ক্রিকেটে DRS খেলার মান বাড়িয়েছে এবং জবাবদিহিতাও বৃদ্ধি করেছে।
DRS ব্যবহার করা যায় কোথায়?
দুই ধরনের সিদ্ধান্তে DRS ব্যবহার করা হয়:
✔ আউট সিদ্ধান্ত:
✔ নট আউট সিদ্ধান্ত:
এছাড়া নো–বল বা ওয়াইডে সাধারণত DRS ব্যবহার করা হয় না (বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যাট–প্যাড হলে দেখা হয়)।
ক্রিকেটে DRS-এর প্রযুক্তিগত কার্যপ্রণালী (Technical Working of DRS)
DRS কয়েকটি প্রযুক্তি একত্রে ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত দেয়:
| প্রযুক্তি | ব্যবহার |
|---|---|
| Hawk-Eye | বল-ট্র্যাকিং, LBW সিদ্ধান্ত |
| Ultra-Edge | এজ শনাক্ত করা |
| Hotspot | ব্যাট–বল সংযোগ শনাক্ত করা |
| Real-time Replay | স্টাম্পিং/রান–আউট |
| Slow-motion Camera | সন্দেহজনক মুহূর্ত ধরা |
DRS-এর সব প্রযুক্তি আলাদা হলেও একসাথে কাজ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে।
ক্রিকেটে DRS-এর সুবিধা
১. সঠিক সিদ্ধান্ত বৃদ্ধি
DRS ব্যবহারের পর থেকে ভুল সিদ্ধান্ত কমে এসেছে প্রায় ৩০–৪০% পর্যন্ত।
২. খেলোয়াড়দের ন্যায্যতা নিশ্চিত
যে ব্যাটার নট আউট ছিল সে আউট হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়েছে; একইভাবে ভুল আউট বাতিল হচ্ছে।
৩. মানুষের ভুল দূরীকরণ
আম্পায়ারও মানুষ—চোখে নজর এড়িয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। DRS সেই ভুল শুধরে দেয়।
৪. ক্রিকেট আরও বিশুদ্ধ ও ন্যায্য
DRS আজ ন্যায্য ক্রিকেটের প্রতীক।
ক্রিকেটে DRS-এর সীমাবদ্ধতা
যদিও ক্রিকেটে DRS অত্যন্ত কার্যকর, তবুও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
১. প্রযুক্তিগত ত্রুটি
যন্ত্র, ক্যামেরা বা সিগন্যাল সমস্যায় ভুল তথ্য আসতে পারে।
২. আম্পায়ারের কল নিয়ে বিতর্ক
অনেকেই মনে করেন Umpire’s Call নিয়মটি বিভ্রান্তিকর।
৩. ব্যয়সাপেক্ষ
পূর্ণ DRS সেটআপ ছোট দেশের জন্য ব্যয়বহুল।
৪. হটস্পট সবসময় সঠিক দেখায় না
বিশেষ করে মৃদু এজ শনাক্তে সমস্যা হতে পারে।
DRS নেওয়ার সময় দলগুলো কী ভুল করে?
অনেক দলই আবেগে ভুল করে তড়িঘড়ি রিভিউ নিয়ে ফেলে। বোলারের জোরাজুরিতে ক্যাপ্টেন DRS নিয়ে ভুল প্রমাণিত হয় এমন ঘটনাও ঘটে। আবার অনেক সময় ব্যাটার ভেবে নেন বল ব্যাটে লাগেনি, কিন্তু Ultra-Edge তার বিপরীত প্রমাণ করে। তাই রিভিউ নেওয়ার সময় ঠাণ্ডা মাথায়, ফিল্ডারদের সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে এবং রিপ্লে’র আভাস দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
DRS ছাড়া ক্রিকেটে কী হতো?
DRS ক্রিকেটকে অনেক “ন্যায্য” করেছে।
FAQ: ক্রিকেটে DRS নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
১. ক্রিকেটে DRS কী?
DRS হলো Decision Review System, যা আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে ব্যবহৃত হয়।
২. ক্রিকেটে কয়টি DRS পাওয়া যায়?
টেস্টে ২টি, ওয়ানডেতে ১টি, টি–টোয়েন্টিতে ১টি।
৩. আম্পায়ার্স কল কী?
এটি এমন পরিস্থিতি যেখানে সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কাছাকাছি; তাই আগের আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে।
৪. কোন প্রযুক্তি DRS-এ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়?
Hawk-Eye (বল-ট্র্যাকিং)।
৫. ক্রিকেটে DRS কি সব ম্যাচে ব্যবহার হয়?
বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক ম্যাচে হ্যাঁ। কিছু ঘরোয়া ম্যাচে বাজেটের কারণে ব্যবহার হয় না।
ক্রিকেটে DRS আধুনিক ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। এটি খেলার ন্যায্যতা নিশ্চিত করে, মানবিক ভুল কমায় এবং খেলাকে আরও স্বচ্ছ করে। বল-ট্র্যাকিং, আল্ট্রা-এজ ও হটস্পট একসাথে কাজ করে সিদ্ধান্তকে নির্ভুল করে তুলে।
DRS আজ শুধু প্রযুক্তি নয়, এটি ক্রিকেটের একটি অপরিহার্য অংশ।
